পয়গামে মুহাব্বত
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
পয়গামে মুহাব্বত
* দুরুদ ও সালামের মর্যাদার স্তর প্রকাশক * নবীপ্রেমের সৌরভে মাতোয়ারাকারী এবং * সফল জীবনের অজিফা দানকারী কয়েকটি লেখা :-
আশ্চর্য
রহস্যান্মোচক ও ইলমী তাহকিকসমৃদ্ধ
দুরুদ শরীফের ফজিলত, মর্যাদা ও বাস্তবতা অনুধাবনে এক অমূল্য রচনা। গভীর মনোযোগ ও ধ্যানের সাথে পড়ুন।
আমরা সকলেই আল্লাহ তায়ালার রহমতের মুখাপেক্ষী। আজ সমস্ত মানুষ বিভিন্ন রকম বিপদ মুসিবতে আক্রান্ত। এই সকল রকম বিপদ-মুসিবতের সমাধান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার রহমতেই হওয়া সম্ভব।
কেউ কেউ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কাফের হয়ে যাচ্ছেন;
কুফরীমূলক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছেন। মুসলমান হওয়ার পর আবার কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট
হয়ে যাওয়া তথা কাফের হয়ে যাওয়াটা এক বিরাট মুসিবত। কিছু মুসলমান
নেফাকী-মুনাফেকীর হামলায় আক্রান্ত। সতর্ক হোন! মুনাফেকের অন্তর্ভুক্ত
হয়ে যাওয়ার ন্যায় মারাত্মক রোগের কথাই বলছি। এটাও এক বিরাট মুসিবত। কিছু মুসলমান এমন রয়েছে যাদের দিল ও দেমাগ, চিন্তা জগতের
পুরাটা সারাক্ষণ শুধু কাম ও রিপু তথা রিপুর তাড়না চরিতার্থ করণের অভিশাপ-চিন্তায় নিমজ্জিত।
এও এক মারাত্মক ক্ষতিকর ধ্বংসাত্মক মুসিবত। কতক মুসলমান শুধু সম্পদের চিন্তায় বিভোর। প্রতিটি মুহূর্তে তাদের চিন্তার একমাত্র
কেন্দ্রবিন্দু মাল ও দৌলত। সারা জীবন সম্পদ সংগ্রহ আর জমা করার লিপ্সায়-নেশায় কাটিয়ে দেয়। এ অবস্থাতেই আজরাঈল আ. সামনে চলে আসেন।
সম্পদ তো এখানেই পড়ে থাকে আর সে শূন্য হাতে সংকীর্ণ অন্ধকার কবরের
বন্দিশালায় বন্দি হয়ে যায়। এটাও এক বিরাট মুসিবত। কতকের ওপর
হামলা হলো ঋণের। একটা ঋণ আদায় করতে না করতেই নতুন ঋণের বোঝা চেপে যায়। দিন-রাত শুধু একজনের ঋণ পরিশোধ করে তো অন্যস্থান থেকে ঋণ গ্রহণ করে। পাওনাদারদের নিকট মিথ্যা
বলতে বলতেই তার জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এটাও একটা মুসিবত। কারো বয়স
পার হয়ে যাচ্ছে; বিবাহ হচ্ছে না। কারো জীবন গুজরানের একটু ঠিকানার
মুসিবত। কোথাও থাকার জায়গা মিলছে না। কেউ গুনাহ ছাড়তে পারছে না।
দিনরাত শুধু গুনাহের খোঁজে আর গুনাহের চিন্তায় বিভোর। কাউকে অকৃতজ্ঞতা এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে- সারাক্ষণ শুধু দিল থেকে আহঃ আর চোখ থেকে পানি ঝরছে। কাউকে অধৈর্য এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে- চব্বিশ ঘণ্টাই অসুস্থতা আর বিপদের বিলাপ চলছে। কাউকে
কর্মহীনতা এমন আক্রমণ করেছে- করার জন্য কোন কাজই পায় না। সময় তার কাটে না। কেউ গীবতের
আক্রমণে এমন আক্রান্ত- সারাক্ষণ তার মুখ
থেকে জীবিত মুসলমানের রক্ত ও গোশতের দুর্গন্ধ বের হতেই থাকে। কাউকে অহংকার এতটাই অপমানিত করেছে- সব সময় আতম্ভরিতা, আর নিজ মান-সম্মান আদায় করতে গিয়ে অপমান অপদস্ত হয়েই চলেছে। কারো ওপর
সন্দেহ ও কু-ধারণার প্রবাহ এতটাই প্রবল যেন বানের পানির ন্যায় ঢল চলছে। কারো ওপর নিদ্রার এমন আচ্ছাদন
যে, বিছানা নিজেই তার শরীরের ভারে ক্লান্ত
হয়ে পড়েছে। আশপাশের সকলেই তার ওপর বিরক্ত হয়ে উঠেছে। কারো ওপর
দরিদ্রতা এমন প্রবলভাবে ঝেঁকে বসেছে- রুটি রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে না। কারো ওপর অসুস্থতা যেন লাইন ধরে আসছেই আসছে। কারো অন্তরে এমন বেদনা-
একমুহূর্তও আনন্দের অনুভূতি পাচ্ছে না। আবার কেউ তো গাফলত ও আনন্দে এমনই আত্মভোলা-
কবরস্তানে গিয়েও গান শুনছে। কেউ একজন তো কারো প্রেমের জালে আটকা পড়ে মাছের ন্যায় ছটফট
করছে তো অন্যজন কারো শত্রুতার ভয়ে ভীত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মুসিবত আর মুসিবত। বিপদ
আর বিপদ। পেরেশানি আর পেরেশানি। ভোগান্তি আর ভোগান্তি।
অথচ আমিও
জানি, আমাকে
অবশ্যই মরতে হবে। আর আপনারাও সকলে জানেন, আপনারাও মারা যাবেন। আমাদের
সকলের এও বিশ্বাস রয়েছে- আখেরাত নিশ্চিত সত্য। জ্বী ভাই! সে কথাই
বলছি, কেয়ামত শতভাগ নিশ্চিত। কেয়ামত অবশ্যই সত্য। দুনিয়া তো হল ধোঁকার
এক জগত। কেয়ামতের ব্যাপারে আমরা খুবই কম
চিন্তা করি; অথচ মূল চিন্তার বিষয়ই সেটা। কেয়ামত আর আখেরাত।
দুনিয়া
তো অস্থায়ী; দুনিয়া তো ধ্বংসশীল। দুনিয়ার জীবন তো একভাবে না একভাবে কেটেই যাবে;
কিন্তু মৃত্যুর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি? কবরের জন্য কতটুকু তৈরি করেছি? চার দিনের জন্য
কোথাও যেতে হলে তো দিনভর চিন্তা করতে থাকি আর প্রস্তুতিতে ব্যয় করি কয়েক ঘণ্টা। আখেরাতের
নিশ্চিত সফরের জন্য কি কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করছি? আল্লাহ আকবার! কি আজব ব্যাপার!
সম্মানিত
পাঠক! বিশ্বাস করুন,
আমাদের আখেরাতের সফলতাও আল্লাহ তায়ালার রহমতেই লাভ হবে। দুনিয়াতে আমাদের মুসিবতসমূহও
আল্লাহ তায়ালার রহমতেই বিদূরিত হবে। আমি একজন লোককে জানি- একবার সে জেলখানায় বন্দি
হয়ে যায়। নানা রকম বিপদ তাকে ঘিরে ধরে। সে দিন-রাত দোয়া আর বিভিন্ন অজিফায় মশগুল
হয়ে পড়ে। কয়েকবার মুক্তি হয়েও হয় না। একবার সে কুরআনুল কারীমের সূরায়ে আম্বিয়া তেলোওয়াত করছিল। তেলোওয়াতের মধ্যেই তার অন্তরে
একটি ভাবনার উদ্রেক হল। সে দেখল কুরআনুল কারীমে স্থানে স্থানে “রহমত”শব্দটি
ব্যবহার হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার রহমত। আর বলা হয়েছে- মুক্তি তো আল্লাহ তায়ালার রহমতে
লাভ হয়। এই বিষয়টি বুঝে আসার পর সে একটি দোয়াকেই তার আমল বানিয়ে নিল। "আয়
আল্লাহ রহম করুন। আয় আল্লাহ রহমত করুন।"
আল্লাহ
তায়ালা আপন মাহবুব নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামকেও
আদেশ করেছেন, আপনি
আল্লাহ তায়ালার নিকট তাঁর রহমত প্রার্থনা করুন।
এবং বলুন, হে আমার
প্রভু। ক্ষমা করুন,
রহম করুন; আপনি সর্বোত্তম
রহম করনেওয়ালা। [সুরা
মুমিনুন- ১১৮]
এই আয়াতে
কারিমায় এও ইঙ্গিত রয়েছে যে,
গুনাহের কারণে মানুষ আল্লাহ পাকের রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। যেমন ইরশাদ হয়েছে:-
তোমরা
কেন আল্লাহ তায়ালার নিকট-ক্ষমা প্রার্থনা করছ না; তাহলেই
তো তোমাদের ওপর রহম (দয়া-অনুগ্রহ) করা হবে। [সূরা
নমল - ৪৬]
এই আয়াতের
পূর্ববর্তী আয়াতসমূহ পড়লে বোঝা যাবে- যখন আল্লাহর রহমত এসে
যায়, সকল বিপদ
মুসিবত দূর হয়ে যায়। সমস্ত আজাব সরে যায়।
ঐ ব্যক্তি
রাত দিন আল্লাহ তায়ালার নিকট তাঁর রহমত চাওয়া শুরু করে দিল। নামাজের পর। তেলোওয়াতের
পর। দুরুদ শরীফের পর। দোয়া করতে করতে এক সময় তার দিলে এক ধরনের প্রশান্তি আসতে শুরু
করল।
সাধারণত
দেখা যায়, মুসিবতের সময় আমাদের দোয়া করতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়। কখনো লোকে
অভিযোগ শুরু করে- হে আল্লাহ! এই কাজটি কেন হচ্ছে না। অনেক সময় অতি আবেগে কেউ বলে বসে
(নাউযুবিল্লাহ) আয় আল্লাহ! ঠিক-বেঠিক যাই হোক আমার একাজটি সমাধা করে দিন। কখনো লোকে
এও বলে- আমি জানি না আমার কোন গুনাহের কারণে আপনি আমার দোয়া কবুল করছেন না। অথচ এরূপ বাক্য
সবই ভুল। এসব বাক্য বেয়াদবি মনোভাব থেকেই উৎসারিত। নাউযুবিল্লাহ।
দোয়া
তো লাঞ্ছিত অপদস্ত গোলামের ন্যায় করা উচিত। নিজের মস্তক অবনত করে দেওয়া
উচিত। নিজের অন্তরকে নরম করে দোয়া করতে হয়। যে দোয়াতে অভিযোগ-অনুযোগ, অহংকার-ন্যাকামি
থাকবে, মনে মনে
ভাববে আমার সাথে এরূপ কেন হচ্ছে; এমন দোয়া উচিত নয়। এটা দোয়ার পদ্ধতি নয়। আমি
অহংকারপূর্ণ অভিযোগ-অনুযোগ করার কে?
কোথা থেকে আমার এই দুঃসাহস?
এমন বেয়াদবির কী কারণ?
দোয়াতে
তো আল্লাহ তায়ালার হামদ ও ছানা, শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা দ্বারা কথা শুরু হওয়া চাই। কখনোই কথার ধরনে, আওয়াজে-উচ্চারণে
কোন প্রকার দাবি-কঠোরতা-অহমিকা-আত্মম্ভরিতা-নিজে প্রাপ্য হওয়ার যুক্তি উপস্থাপন ইত্যাকার
কোন কিছু না হওয়া চাই। প্রসঙ্গ কথা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল। ঐ ব্যক্তি রহমতের দোয়া করতেই থাকল। আল্লাহ পাকের আজব নেজাম। যাচনাকারী তাঁর
খুব পছন্দ। যাচনাকারীর পথ
তিনিই খুলে দেন।
তুমি
যদি রহমত চাইতে থাকো রহমত
মিলবেই ইন শা’ আল্লাহ। রহমত প্রাপ্তির আমলের
তাওফিকও নিজে নিজেই মিলতে থাকবে। অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই
আল্লাহ তায়ালার রহমত এমনভাবে এল যে সারা জগত আশ্চর্য হয়ে গেল। মুক্তির পর সে একজন
বড় বুজুর্গ আলেমকে ঘটনা শোনালে তিনি বললেন, তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করা হয়েছে। বাস্তবতা হল, আল্লাহ তায়ালার
রহমতেই আমাদের সকল সমস্যার সমাধান মিলতে পারে।
আপনি
কুরআনুল কারীমে গভীর দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবেন- কোরআনে পাক বিভিন্নভাবে এ কথাই বোঝাচ্ছে-
সব মুসিবত গুনাহের কারণেই আসে। এবং কোরআনে পাক এও বলে দিয়েছে গুনাহ থেকে বাঁচা তখনই
সম্ভব যখন আল্লাহ তায়ালার রহমত সাহায্যকারী হয়।
[অধম অনুবাদক বিশ্বাস করে ঘটনাটি মুহতারাম লেখক মাওলানা মাসউদ আজহার দা.বা.-এর নিজেরই ঘটনা।]
(আয় আল্লাহ!) যাকে আপনি সে দিন গুনাহ থেকে বাঁচাবেন তাকে আপনি নিঃসন্দেহে রহমত করেছেন। [সুরা গাফির: ০৯]
মুফাস্সিরিনে
কেরামের একদল “ইওয়াওমা ইযিন” অর্থাৎ
"সে-দিন" এর অর্থ করেছেন কেয়ামতের দিন। অর্থাৎ সে দিন বিপদ থেকে মুক্তি
আল্লাহ পাকের রহমতেই লাভ হবে। তবে অন্য মুফাস্সিরিনে কেরামের মতে “ইওয়াওমা ইযিন” দ্বারা উদ্দেশ্য দুনিয়া। অর্থাৎ দুনিয়াতে
যাকে আল্লাহ তায়ালা গুনাহ থেকে বাঁচালেন- এটা তার ওপর আল্লাহ তায়ালার রহমতের প্রমাণ। হজরত
শাহ আবদুল কাদের রহ. আয়াতটির ব্যাখ্যামূলক অনুবাদে লিখেন, আপনার মেহেরবানি হলেই গুনাহ থেকে বাঁচা সম্ভব। নিজ আমলের জোড়ে কেউ বাঁচতে
পারে না। অল্পস্বল্প গুনাহ থেকে তো কেউই মুক্ত নয়। ভেবে দেখুন, আমাদের সবচেয়ে
ক্ষতিকারক দুশমন আমাদের নিজের নফস। আর এই নফসের অনিষ্টতা-ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়াও আল্লাহ
তায়ালার রহমতেই সম্ভব। এছাড়া কোন উপায় নাই।
নিশ্চয়ই
নফস মন্দ
কাজেরই শিক্ষা দেয়। তবে যার ওপর আমার প্রভু দয়া করেন। [সুরা ইউসুফ :৫৩]
পবিত্র
কুরআনুল কারীমে বারংবার উল্লেখ হয়েছে- “যখনই কোন আজাব এসেছে ঐ আজাব থেকে ঐ ব্যক্তিই
মুক্তি পেয়েছে যাকে আল্লাহ রব্বুল আলামীন রহমত দিয়ে বাঁচিয়েছেন।” এই প্রসঙ্গে আয়াত যদি লিখতে শুরু করি আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। আসহাবে
কাহাফ যখন তাদের দুশমন বাদশাহের নিকট বন্দি ছিল তারা আল্লাহ তায়ালার নিকট রহমত প্রার্থনা
করেছে।
হে আমাদের
প্রভু! আমাদের ওপর আপনার রহমত নাজিল করুন। এবং আমাদের এই কাজের জন্য আমাদেরকে সঠিক
পথ দেখান। [সুরা
কাহাফ : ১০]
দুশমন
থেকে হেফাজত যেমন আল্লাহ তায়ালার রহমতে লাভ হয় তেমনি শক্তি সামর্থ্য দুশমনের ওপর
বিজয় সবই আল্লাহ তায়ালার রহমতেই লাভ হয়ে থাকে। বাদশাহ যুলকারনাইন যখন ইয়াজুজ-মাজুজের
সামনে লোহার প্রাচীর তৈরি সম্পন্ন করলেন,
তাদের পরাজিত করলেন তখনই তিনি বলেছিলেন এটা আমার প্রভুর রহমত-অনুগ্রহ। [সুরা
কাহাফ : ৯৮] অর্থাৎ
তিনি স্বীকার করলেন ও ঘোষণা দিলেন,
আমার এই সকল শক্তি,
সামর্থ্য ও বিজয় আল্লাহ তায়ালার রহমতেই লাভ হয়েছে। সব কথার সার কথা হল, দুনিয়াতে সফলতাও
আল্লাহ তায়ালার রহমতেই লাভ হয়। আখেরাতে মুক্তি-সফলতাও আল্লাহ তায়ালার রহমতেই পাওয়া
যাবে।
قل إنى اخاف إن عصيت ربي عذاب یوم
عظیم ، من يصرف عنه يومئذ فقد رحمه ، وذلك الفوز المبين.
বলুন, আমি যদি আমার
প্রতিপালকের অবাধ্যতা করি তবে আমি অবশ্যই এক মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। সে দিন
যার থেকে শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে,
আল্লাহ অবশ্যই তার প্রতি দয়া করেছেন। আর এটাই সুষ্পষ্ট সাফল্য। [সুরা আনআম : ১৫-১৬]
আল্লাহ
তায়ালার রহমতভাণ্ডারের একটি বড় স্তরের নাম "ফজল"। আল্লাহর
রহমতের প্রসঙ্গ এবং এর আলোচনা যেমন ব্যাপক তেমনই হৃদয়কাড়া। যেমন হৃদয়কাড়া তেমনই
ব্যাপক। এই মুহূর্তে আমার সামনে কয়েকটি আয়াতে মোবারকা রয়েছে, সেগুলোই লিখে
দিচ্ছি। আল্লাহ তায়ালা যদি আপনাকে তাওফিক দান করেন; যদি আপনার ওপর রহম করেন কুরআনুল কারীমের রহমতবিষয়ক আয়াতসমূহ
তরজমা ও তাফসীরসহ পড়ে নিবেন। তাহলে যেই মহান সত্তা রহমান, রহীম ও আরহামুর
রহীমীন আমরা তাঁর রহমতের যে কতটা মুখাপেক্ষী তা গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে। তাহলেই
প্রকৃত ভিখারীর ন্যায় কাকুতি-মিনতি সহকারে আল্লাহর নিকট রহমত চাইতে থাকার যোগ্যতা
তৈরি হবে।
يَا
حَيُّ يَا قَيُّومُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ بِرَحْمَتِكَ اَسْتَغِيْث رَبِّ
اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا
وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَنَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ .
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا
لنكونن من الخاسرين
আর রহমান! রহম করুন। আর রহীম! রহমত করুন। ইয়া আরহামার রাহীমীন!
রহম করুন। রহমত করুন।
রহমতের
স্তরসমূহ
এতক্ষণ
একটি প্রসঙ্গ আলোচিত হল। এবার দ্বিতীয় বিষয়টি অনুধাবনের প্রতি মনোযোগী হোন। আল্লাহ
তায়ালার রহমতের আলাদা-আলাদা স্তর রয়েছে। একটা হল সাধারণ-ব্যাপক রহমত। যা দুনিয়াতে
প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি
প্রাণী এমনকি প্রতিটি বস্তুর ওপরই প্রযোজ্য। প্রতিটি
প্রাণী যে শ্বাস গ্রহণ করছে, রিজিক পাচ্ছে- এটাও তো নিঃসন্দেহে আল্লাহর রহমত ভিন্ন কিছু নয়। আরেকটা
আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত; যা আল্লাহ তায়ালা কেবল ঈমানদারগণকে দান করেন।
দুনিয়াতেও, আখেরাতেও।
আখেরাতে
তো রহমতের প্রসঙ্গটাই শুধু ঈমানদারদের সাথে নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। এই বিশেষ রহমতের আবার
স্তর বিন্যাস রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তরের রহমত তো লাভ করেছেন আম্বিয়া ও ফেরেশতাগণ আলাইহিমুস
সালাতু ওয়াস সালাম। এরমধ্যেও সবচেয়ে মহান যে রহমত তা প্রাপ্ত হয়েছেন রহমাতুললিল্
আলামীন হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর ওপর
সর্বক্ষণ আল্লাহ তায়ালার রহমতের ভাণ্ডার খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে বর্ষিত হতেই থাকে।
ان الله وملئكته يصلون على
النبي
নিশ্চয়ই
আল্লাহ তায়ালা রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ রহমতের দোয়া করেন নবীজী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের জন্য। [সুরা আহযাব : ৫৬]
সালাত
অর্থ খুসুসি-বিশেষ রহমত। এই খুসুসি রহমতের মাধ্যমে নূর ও উন্নতির রাস্তা লাভ হয়। সব
রকমের অন্ধকার বিদূরিত হয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:-
তিনি
(আল্লাহ তায়ালা) তোমাদের উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণও; যেন তোমাদেরকে
অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। তিনি
ঈমানদারগণের ওপর অত্যন্ত মেহেরবান-রহমতওয়ালা। [সুরা আহযাব : ৪৩]
বুঝা
গেল আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি "সালাত” (যার অর্থ করা হয় রহমত বর্ষণ) ঐ বিষয় যদ্বারা
মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের সর্ব সমস্যার সমাধান হয়। কেননা নূর লাভ করাটাই হল সকল অন্ধকার
থেকে মুক্তির উপায়। আর গুনাহ থেকে শুরু করে জাহান্নাম পর্যন্ত সকল বিপদই একেকটা অন্ধকার।
আল্লাহ
তায়ালার এই সালাত হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের ওপর এত অধিক পরিমাণে
বর্ষিত হয় যে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং আল্লাহর রহমত হয়ে
গিয়েছেন। তাইতো আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :- وما ارسلناك إلا رحمة للعالمين
রহমত
লাভের উপায়
এই দ্বিতীয়
বক্তব্যটিও যদি বুঝে থাকেন,
এবার তাহলে তৃতীয় ও শেষ বক্তব্যটি বুঝুন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে মুসলমানদিগকে
হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত ও সালামের আদেশ দিয়েছেন।
আমাদের জন্য এর প্রতিদান নির্ধারণ করেছেন, আমরা যখন একবার দুরুদ পাঠ করবো প্রতিদানে আল্লাহ
তায়ালা দশটি সালাত খুসুসি-বিশেষ রহমত নাজিল করবেন। কোনো কোনো বর্ণনায় তো সত্তর-এরও
উল্লেখ রয়েছে। সহিহ হাদীসসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে من صلى على واحدة صلى الله عليه
عشرا যে ব্যক্তি আমার
ওপর একবার দুরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করবেন। [সহিহ মুসলিম
: ৪০৮]
উপর্যুক্ত
তিনটি আলোচনার পর শেষ কথাটা আমাদের জন্য সহজ। প্রথম আলোচনা ছিল, আমরা আল্লাহ তায়ালার রহমতের খুবই মুখাপেক্ষী। আজ চারিদিকে শুধু বিপদ আর বিপদ; ভোগান্তি আর ভোগান্তি।
দ্বিতীয় আলোচনা ছিল, আল্লাহ
তায়ালার বিশেষ রহমতকে 'সালাত' বলে। এই রহমতের
মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের সব সমস্যার সমাধান হয়। তৃতীয় হল, দুরুদ শরীফের
আমলের মাধ্যমে বান্দা এই বিশেষ রহমত লাভ করে।
তাহলে
অতঃপর আর দেরি কিসের?
আজ থেকেই অতি অধিক পরিমাণে দুরুদ শরীফের আমল করে নিজের বিপদ, মুসিবত,
ভোগান্তি, বেকারত্ব
সব দূর করুন। এবং দুনিয়া-আখেরাতে আল্লাহ তায়ালার খাস রহমতের স্বাদ আস্বাদন করতে থাকুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন