মস্ত চিঠির ক্ষুদ্র পত্র
بسم الله الرحمن الرحيم
بسم الله اللهم صل و سلم علي
سيدنا و مولانا محمد و على اله و اصحابه اجمعين
আমার
এক প্রিয় অনুজ আমাকে লিখেছে- “ভাইয়া, বাইতুল্লাহ
সফরের তাওফিক হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। ভিসা হয়েছে। আপনার আলোচনা শুনে শুনে হৃদয়ে এ
তামান্না সে বহু বছর আগেই জন্ম নিয়েছিলো। হৃদয়ে আশা ছিলো, আপনার সাথে রব যেন সফরসঙ্গী করেন। ভাইয়া, আপনার দোয়া ও নসিহা কামনা করি। বাইতুল্লাহ
সফরের জন্য কিছু পাথেয় আমাকে দিয়েন!”
ছোট
বেলা থেকেই চিঠি লেখা আমার অন্যতম শখের কাজ। আমার লিখিত বিশেষ বিশেষ চিঠিগুলো
একত্র করা গেলে সহিত্যপ্রেমীদের জন্য পছন্দের একটি সংকলন হতো। শুধু নিজের নয়; অন্যদের চিঠিও লিখতে হয়েছে অনেক। কিন্তু
স্নেহের শওকতের উপর্যুক্ত ছোট্ট কিন্তু মস্ত চিঠির উত্তরে একটি পত্র লেখা এতটাই
কঠিন ও অসম্ভব মনে হচ্ছে, ২২ তারিখের চিঠির উত্তর লিখতে বসেছি আজ ২৯/০৯/২০২৫ঈ.। এক সপ্তাহ ফিকির করেও শুরুই
করতে পারছি না। শূন্য হৃদয়ে বসেছি সাহেবে হারামে মুনাওয়ারার সুপারিশের তামান্নায়। মালিকে হারামাইন শরীফাইনের
দয়ার আশায়।
প্রিয়!
ইহরাম পরে উমরার নিয়ত করার পর থেকে তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত সর্বোত্তম জিকির
তালবিয়া। অনেকে মনে করেন, ইহরাম
যতটা সম্ভব শেষে করাই উত্তম যেন অজান্তেও কোন নিষিদ্ধ কাজ না হয়ে যায়। আশেকীন
মনে করে, যতটা সম্ভব আগেই তুমি মুহরিম হয়ে যাও। মালিকের মেহমান সাজবে- এই সাজেও একটা
আনন্দ আছে। প্রেমময়ের নির্দেশিত পোশাকে দুনিয়ার সকল কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করে
-এমনকি হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়াবী পছন্দের একটি
সুগন্ধি। সেই সুগন্ধি থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে- প্রেমময়ের ইন্তেজার, তাঁর ঘরের অভিমুখী হয়ে অপেক্ষার অনলে দগ্ধ
হওয়ার চেয়ে প্রিয় কিছু প্রেমিকের জানা নেই। প্রকৃত প্রেমিক প্রেমময়ের জন্য
বিসর্জন পছন্দ করে। এই সফরের বড় প্রাপ্তিই হচ্ছে তাকালীফ (নানা রকম
কষ্ট)। তাকালীফ
থেকে বাঁচার জন্যে তাখির (ইহরাম পরতে দেরি করা) বুদ্ধিজীবীর যুক্তিতে সঠিক হলেও
প্রেমের অভিধানে এটা নেই। এই সময়টুকুন ছাড়া জীবনভর তুমি যতই তালবিয়া পড় সেটা
একটা জিকির হিসেবে গণ্য হলেও হুকুমের স্টিকারশূন্য। তুমি কি দেখ নাই- স্টিকারযুক্ত
আর স্টিকারশূন্য গাড়িগুলোকে সরকারি বিশষ বিশেষ এরিয়ায় কীভাবে আলাদা করা হয়?
গায়ে
দুই টুকরা কাফন তুমি নিজেই জড়িয়ে লও। ওয়ারিসিন যেন বঞ্চিত না হয় একটির দায়িত্ব
তাদের ওপর থাক। এবার চল মালিকের দিকে। মালিকের ঘরের দিকে। কালো গিলাফে ঢাকা ঐ ঘরের
পথে চলতে থাকো। জবানে তালবিয়া। মুখে লাব্বাইক। অন্তরে
ইস্তেগফার। ক্বলবে তাওবা। একবার ভাবো তো- তিনি মেজবান! আমি মেহমান! আহ…
আমি
তো ঐ “বালাদুল
আমীনে” প্রবেশের যোগ্য নই। আমার অনুপ্রবেশ এই শহরের জন্য একটি কলঙ্ক। আপাদমস্তক
পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন এই আমার কীভাবে এত দুঃসাহস হলো, হারামে মক্কাকে
কলঙ্কিত করব? যেই
মহান মালিক সব জেনেও আমায় সফরের অনুমতি দিয়েছেন; তাঁর কদমে কুদরতীকে ক্বলব দিয়ে জড়িয়ে ধরে ইস্তেগফার করতে
থাকো। হে হানিফ! সাবধান!! এই তুমি যদি হারামের সীমানা অতিক্রম করেই ফেলো- এ তোমার
মস্ত দুর্ভাগ্য। তুমি হতভাগাকে বিশেষায়িত করার মতো বিশেষণ পৃথিবীর কোনো ভাষায় কোনো
কালে তৈরি হয়নি।
কাফনের
দুটি কাপড় গায়ে দেখেও কি নিজের চারপাশে মসজিদের ঐ খাটিয়াটা অনুভব করতে ব্যর্থ হচ্ছ? এ ব্যর্থতা নিয়েই মীকাত অতিক্রম করো না। মীকাতে
পৌঁছার পূর্বেই খাটিয়াটা অনুভব করে খাঁটি তাওবা করো। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে
নিশ্চয়তা দিচ্ছি- যে মহান তোমাকে অনুমতি দিয়েছেন সে মহান তোমাকে ক্ষমা করবেন।
তোমাকে পবিত্র করেই মীকাতে প্রবেশ করাবেন। শর্ত তোমার তাওবাটা যেন খাঁটি হয়।
ইস্তেগফারটা যেন সত্য হয়।
জবানে
তালবিয়া, মুখে
লাব্বাইক, অন্তরে
ইস্তেগফার, ক্বলবে তাওবা। চলতে চলতে তোমার মন চাচ্ছিল মীকাতের দূরত্ব যেন
হাজার হাজার মাইল বৃদ্ধি পেতেই থাকে। দীল দরিয়ায় ওঠা মৌজ (ঢেউ) সমগ্র অস্তিত্বে
জমে থাকা পাপের সকল আবর্জনা একত্র করে চোখে আছড়ে পড়তে পড়তে যেন নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক
হই। তারপর যেন আসে হৃদয়রাজ্যের সেই শাহী গেইট “মীকাত”।
কিন্তু
যাত্রা শুরুর একটু পরেই হঠাৎ উড়োজাহাজের স্পিকারে ভেসে এল অজস্র
কাঙ্ক্ষিত; অনাকাঙ্ক্ষিত
সেই ঘোষণা।
“অল্প কিছুক্ষণ পরেই আমাদের
এয়ারবাস পবিত্র মীকাত অতিক্রম করবে। যারা এখনো মাইয়্যেতের সাজ গ্রহণ করেননি দ্রুত
সেজে নিন।” ইহ জীবনে যেমন মাওলার দীদারে
হাকীকী হয় না। ইহ জাগতিক লেবাসে তেমন মাওলার শহরের শাহী গেইট অতিক্রম করা যায়
না।
আমার
পাপরাশির চিন্তা প্রবল হলে মনে চায় মীকাতের দূরত্ব হাজার হাজার মাইল বৃদ্ধি পেতেই
থাকুক। আবার যখন আরহামুর রহিমীনের রহমতের আশার প্রাবল্য ঘটে তখন আর ‘তর’ সয় না। এখনো মীকাতই আসছে না? কখন আসবে শাহী গেইট?
তারপর বাড়ির সীমানা-হুদুদে হারাম। তারপর মসজিদে হারাম। সবশেষে আসবে
আমার মাওলার ঘর। কালো গিলাফে মোড়ানো চির সুন্দর, চির অম্লান, চির
অমলিন, প্রতিটি
মুমিনের হৃদয়রাজ্যের অনন্ত স্বপ্নের সেই ঠিকানা।
হঠাৎ
করেই মীকাত যেহেতু এসেই গেল সুতরাং নিশ্চিত হও, একীন করো যেই আরহামুর রহিমীন পৌঁছে দিয়েছেন, তিনি তোমাকে
অবশ্যই ক্ষমা করেছেন। কারণ তাঁর রহমত কিন্তু যোগের হিসাবে বৃদ্ধি পায় না বরং
গুণের হিসাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঐ গুণের হিসাবের সর্ব প্রথম অংকটিও মানুষের জানা
সকল সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক বড়। তোমাদের হিসাব বিজ্ঞানের বিলিয়ন ট্রিলিয়ন
সেখানে কোন ছাই! তোমার যদি কান থাকে (ক্বওলে উ-রা লাহনে নায়, আ-ওয়াযে নায়) তাহলে তুমি শুনতে পাবে মীকাত অতিক্রমের সাথে সাথেই তোমাকে বলা হচ্ছে- আহলান সাহলান; মাগফুরুল্লাকুম ইয়া যুয়ূফুর রহমান। মাগফুরুল
লাকুম।
এখন
তুমি আর তোমার জানা পৃথিবীতে নও। রহমানের বাড়ীর অনেক দূরেই থাকে তাঁর শাহী গেইট।
গেইট অতিক্রম করার অর্থই তুমি এখন তাঁর মেহমান। আরহামুর রহিমীন তোমার মেজবান। তিনি
বড় দয়ালু। অসীম তাঁর দয়া। তিনি বড় করুণাময়। সীমাহীন তাঁর করুণা। তিনি বড়
শরীফ। এখন প্রতিটি কদমে কদমে তাঁর শারাফাত প্রত্যক্ষ করবে। দিলের চোখ খুলে দেখো, অন্তরের কান পেতে শোনো, প্রতি
মুহূর্তেই তোমাকে আরো অধিক নৈকট্য দান করা হচ্ছে। মেজবান তাঁর মেহমানদারি পরিবেশন
করেই যাচ্ছেন। আমার কারণে আমি যদি তা গ্রহণে ব্যর্থ হই- সেটা আমার ব্যর্থতা। মেহমানের
উচিত মেজবানের পছন্দমত থাকা। পছন্দমত চলা। প্রতিটি কাজের পূর্বেই মেজবানের পছন্দ
চিন্তা করে সিদ্ধান্ত লওয়া। তিনি তাড়াহুড়া পছন্দ করেন না। তোমার জীবনের অভ্যাস
যাই হোক তাঁর বাড়িতে থাকাবস্থায় মুহূর্তকালও ‘তাড়া’কে অন্তরে স্থান দিও না।
প্রয়োজনানুযায়ী
আরাম-বিশ্রামের পর নব উদ্যমে নতুন উৎসাহে মাওলার ঘরের দীদারে যাও। মসজিদে হারামের
নির্ধারিত “বাব” দিয়ে
প্রবেশ করলেই কেবল দেখা যাবে চির সুন্দর চির প্রেমময় ঐ কাবাতুল্লাহ। এই অধম যে
বাবকে কলঙ্কিত করেছিলাম সেটার নম্বর ৭৯। কাবাতুল্লাহকে প্রথমবার দেখার জন্য যত প্রস্তুতি
সারা জীবন গ্রহণ করেছ, দোয়া মুখস্থ করে এসেছ সব যদি ভুলে যাও তাতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। এ দীদার এ
দর্শন তুমি প্রস্তুতির বিনিময়ে লাভ করো নাই। এটা দান করা হয়েছে। সুতরাং তিনি
যেমন চাইবেন তেমন হবে। তুমি নিজের ওপর জোড় করতে যেও না। যা ঘটে ঘটতে দাও। যতটুকু
মনে পড়ে আর যা মনে আসে সে দোয়াই করো। যদি মুখে কিছু বলতে না পারো, সব ভুলে যদি নির্বাক তাকিয়ে থাকো তাতেও অবাক
হওয়ার কিছু নেই। শুধু এতেই পরিতৃপ্ত হতে থাকো- ঘরের মালিক যা চাচ্ছেন তাই হচ্ছে। যেভাবে চাচ্ছেন সেভাবেই
ঘটছে। তুমি যদি তোমার এই প্রথম দেখাকে দীর্ঘ করতে চাও অন্যদের পথে বাধা হয়ে থেকো
না। একপার্শ্বে চেপে দাঁড়াও। মনভরে দেখো। দেখে দেখে মন ভরো। যতই তাকাবে, যতই দেখবে মন ভরবে না। তৃষ্ণা
শুধু বাড়তেই থাকবে। একসময় মনে হবে কাছে গেলে বুঝি পিপাসা মিটবে। জিসমী পিপাসা
মেটানোর আবে জমজম পাবে তুমি হাত বাড়ালেই। কিন্তু কলবী পিপাসা! সে তো মিটবার নয়।
ঠিক
আছে এবার অগ্রসর হও। সামনে এগিয়ে সিঁড়িযোগে নামতে হবে মাতাফে। জিসমী
চোখের এই “নামা” নামা নয়। এই “অবতরণ” অবতরণ নয়; এতো মহান ও চলমান উড্ডয়ন। “ফালা রফাসা ওয়া-লা ফুসূক্বা ওয়া-লা জিদালা ফিল হাজ্জ”।
অশ্লীল কথা, গুনাহ
ও ঝগড়া হতে মুক্ত থেকে যদি “কা ইওয়াওমিন ওয়ালাদাতহু উম্মুহু” সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায়
হয়ে আসতে পারো; যতদিন
নতুন গুনাহ না করবে ততদিন উড্ডয়ন চলমান থাকবে। শুভ্র মাতাফে শুভ্র পোশাকে শত দেশের সহস্র
বর্ণের আশেকীনের সাথে এই অধম গোনাহগারকে মাওলা কবে মিলিত করবেন তিনিই জানেন। কেউ
জানে না। আমার বেয়াদবী-অপরাধের গুরুতরতার বিচারে ইহকালে আর অনুমতির...। এখানে যে বঞ্চিত সে তো
সেখানেও ...। বেয়াদবী যতই মারাত্মক হোক, অপরাধ যতই গুরুতর হোক; আরহামুর
রহিমীনের এক রহম দৃষ্টিতে সব ভস্ম হয়ে যাবে। আবার তিনি অনুমতি দিবেন। নিয়ে যাবেন
আগের মতই দুই মাস অন্তর অন্তর অথবা তারচেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে। এই আশায় বুকটা
সারাক্ষণ চিনচিন করে। যার দয়া যোগের হিসাবে নয় বরং গুণের হিসাবে বৃদ্ধি পায় তাঁর
দয়ার সাগরে কোনো বেয়াদবিই মারাত্মক নয়। কোনো অপরাধই গুরুতর নয়। শুভ্র লেবাসে
শুভ্র মাতাফের হে প্রিয়, এই
নাফরমানের জন্য একটু সুপারিশ করো। নিশ্চয়ই অপরাধ বিবেচনায় আমি ক্ষমার অযোগ্য।
কিন্তু তিনি তো ক্ষমার অযোগ্যকেও ক্ষমা করেন এবং পূর্বের চেয়ে অধিক করুণা দ্বারা
সিক্ত করেন।
শোন!
তাওয়াফ শুরু করার পর কাবার দিকে তাকানো নিষেধ। মনে চাইলে তাওয়াফের নিয়ত না করেই
কিছুক্ষণ চক্কর লাগাও। তবে সাবধান! আমি কিন্তু বলছি না, এই চক্কর তোমার পিপাসা নিবারণ করবে। অশান্ত
হৃদয়কে শান্ত করবে। এই চক্কর এই দীদার এই দর্শন যদি তোমার পিপাসাকে আরও বাড়িয়ে
তোলো। হৃদয়কে আরও অশান্ত করে। দহন-যন্ত্রণা যদি আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হতেই
থাকে তবে শোকর কর। প্রকাশ করো না। যেদিন ঘরের মালিক আপন দীদার দান করবেন, ঐ দীদারে হাজার বছরের জন্যে বেহুশ হয়ে যাওয়ার
পূর্ব পর্যন্ত এই দহন-যন্ত্রণা তীব্রতর হতে থাকাই ঈমানের স্বাদ।
প্রিয়
হে! বারবার অপ্রয়োজনীয় অতি কথায় তোমাকে বিরক্ত করে তুলেছি। আর নয় (?)। দ্রুত রুকনে ইয়ামানী অতিক্রম করে অগ্রসর হও এবং
বাইতে আসওয়াদের পূর্ব-উত্তর কোণে স্থাপিত হজরে আসওয়াদকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু
করো। মনে-মুখে বলো, আমি তাওয়াফের নিয়ত করছি- আপনি কবুল করুন। আমার জন্যে সহজ করুন। যদি মনে
চায় মনে মনে এও বলো, কেয়ামত
অবধি যত তাওয়াফকারী সকলের জন্যই সহজ করুন। এ ঘরের শুরু থেকে সকল ঈমানদার জীন ও ইনসানের
তাওয়াফ কবুল করুন।
নাফরমানকে
যখন ঘোরানো হচ্ছিল, দিলে
এল- স্কুলপালানো
কিশোর সারাদিন ঘোরাঘুরি আড্ডাবাজি শেষে যখন বাড়ির কাছাকাছি এসে প্রতিবেশী খালার
কাছে শুনতে পায় আজ তোর খবর আছে! মা-বাবা দু’ জনই রেগে আগুন হয়ে আছে।
ওদিকে রাত হয়ে যাওয়ায় বন্ধুরা সবাই যার যার বাড়ি চলে গেছে। বাজারের দোকানগুলো সব
বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ঐ নিরুপায় কিশোর যেমন মাথা নিচু করে
বাড়ির চারপাশে ঘুরতে থাকে। আর মনে মনে বিশ্বাস করে, সারাদিন
নাওয়া-খাওয়াহীন এই আমাকে ঘুরতে দেখলে আম্মার মনে অবশ্যই দয়া হবে। দেরিতে হলেও মা
আমায় অবশ্যই ডাকবেন। একীন করো শওকত! আমার মাওলা একজন মায়ের চেয়ে যত গুণ অধিক
দয়ালু; আমার নাফরমানী কিন্তু স্কুলপালানোর চেয়ে অতগুণ বেশি
নয়। একীন করে একটু সুপারিশ করো যেন তোমার মত আমাকেও আবার ঘোরানো হয়। ঘোরানোর
পালা যেন জীবনভর ঘুরে ঘুরে মাসে মাসে আসতেই থাকে। তুমি তো দান করবে না- শুধু
সুপারিশ করবে, তাহলে আবার কৃপণতা কিসের?
তাওয়াফ
চলছে। জীবনের অতীব মূল্যবান মুহূর্তগুলো অতিবাহিত হচ্ছে। এ সময় মেজবানের নিকট বলতে
থাকো, যা বলতে চাও। চাইতে থাকো, যা চাওয়ার আছে। নিশ্চয়ই সব
পাবে। যেখানে পেলে যেভাবে পেলে তোমার মঙ্গল হবে সেখানে। সেভাবে। এই মাতাফেরই কোনো
একস্থানে হজরত হাজেরা আ. ও হজরত ইসমাঈল আ.-এর রওজা। যদি দিল চায় তাদের ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যেও কিছু আমল করে নিও।
সাত আসমান। সাত জমিন। সাত চক্কর।
এই সাতের ভিতর কী আছে তিনিই জানেন। সাতকে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সাতকে যিনি নির্বাচন
করেছেন। চিন্তা করে দেখলাম, মানব জীবনের স্তরও সাতটা। এক রূহ
জগৎ, দুই মায়ের পেট, তিন ইহকাল বা
দুনিয়ার জীবন, চার কবর, পাঁচ হাশর-মিযান, ছয় পুলসিরাত, সাত
জান্নাত বা জাহান্নাম। প্রথম তিন চক্করের রমল থেকে যদি কেউ সবক নিতে চায়- জীবনের এই তৃতীয় ধাপের পর আর কিছু করার নেই। ফায়সালা মতো শুধু চলতে থাকবে।
তাই এখনই যা কিছু করার করে লও। যে সবক নিতে চায় নিতে পারে,
কেউ বাধা দিবে না। অনেকের মুখেই শুনেছি, বাইতুল্লাহকে বাম
দিকে রেখে চক্কর দিতে হয়। তাওয়াফ করতে হয়। আমার মনে চায় এভাবে বলি, মাওলা পাক তাঁর ঘরের মেহমানকে এমনই সম্মান করেছেন, শরাফতি দেখিয়েছেন- বলেছেন, তুমি আমার ঘরের ডান দিক দিয়ে চক্কর লাগাও।
তাওয়াফ শেষ হলে জমজম পান করে তাওয়াফের নফল আদায় করে মুনাজাত করিও। এই মুনাজাতের তৃপ্তি অন্যরকম। আমার লিখার সাধ্য নেই। সাথে থাকা
আম্মা-আব্বার যেন অধিক কষ্ট
না হয় সে দিকে খেয়াল রেখে যত পারো দোয়া করে লও।
মাতাফের অতি লোভনীয় ৩টি বিষয় হলো, হজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া।
মুলতাযাম ধরে দোয়া করা। হাতিমে প্রবেশ করে নামাজ পড়া। সায়্যিদুনা হজরত ওমর রাদি. একদা তাওয়াফের সময় হজরে আসওয়াদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ওহে তুমি তো একটি পাথর মাত্র। যদি আমার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে চুম্বন না করতেন তাহলে আমিও তোমাকে চুম্বন করতাম না। সায়্যিদুনা হজরত ওমর রাদি.-এর উক্তির বিশ্লেষণ করে অনেকে বোঝাতে চায় হজরে
আসওয়াদে চুম্বন তাওয়াফের একটি নিয়মমাত্র। একটি শৃঙ্খলার চেয়ে অধিক এর কোনো
গুরুত্ব নেই। অপরদিকে, কিছু
মানুষ যেন পারলে বলে বসত, হজরে
আসওয়াদে চুম্বন মানে- আল্লাহ তায়ালার কুদরতি হাতেই চুম্বন করার মতো। লোকমুখে শুনে থাকি- এই
বেহেশতি পাথরটা প্রথমে সাদা ছিল। যখন কোনো বান্দা চুমু খায় সে ঐ বান্দার সব গুনাহ
শুষে নেয়। বান্দাদের গুনাহ শোষণ করতে করতে পাথরটি কালো হয়ে গিয়েছে। ইলমে
ফিকহের দৃষ্টিতে এসব কথা বাড়াবাড়ি। তবে অবশ্যই হজরে আসওয়াদের আলাদা গুরুত্ব
রয়েছে।
বাইতুল্লাহ
সফরে আমার একজন বিশেষ মুহসিন ছিলেন কুমিল্লা বরুড়ার মুফতি শরিফুল ইসলাম। আল্লাহ
তায়ালা তার শরাফতি আরো বাড়িয়ে দিন। সে আমায় সাহস ও গার্ড দিয়ে হজরে আসওয়াদে
চুমু খাওয়ার সে বিরল সৌভাগ্যের ব্যবস্থা করে দেয়। সাহস দেওয়ার মতো হৃদয় ও
আত্মার সাথে সাথে শরীরও আল্লাহ তাকে দান করেছেন। রুকনে ইয়ামেনির দিক থেকে বাইতুল্লাহর
দেয়াল ঘেঁষে অগ্রসর হতে থাকলাম। শরিফ বলল, হুজুর! ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থাকেন। দেখবেন এসে গেছে।
শরিফের শরাফতির শারাফাত রক্ষা করাই তখন আমার কাজ। সে পিছন দিক থেকে আমাকে আগলে
রাখার চেষ্টা করল। আমি বলি, আপনার
এত কষ্ট করা লাগবে না। সে বলল, এখন
ক্লান্ত হলে চলবে না। শক্তি লাগবে। শক্ত থাকতে হবে।
হজরে
আসওয়াদ। একটি পাথর। যে পাথরটি বাইতুল্লাহ শরিফের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে মাতাফ থেকে এক
পুরুষ উপরে চারপাশ রুপা দিয়ে মুড়িয়ে লাগানো আছে। এখান থেকেই তাওয়াফের চক্কর শুরু
হয়। শুরুর সময় নামাজের তাকবীরে তাহরিমার মতো হাত উঠিয়ে “বিসমিল্লাহি
আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ” বলে সেজদায় হাত-রাখার
ন্যায় হজরে আসওয়াদের উভয় পাশের রুপার থালায় হাত রেখে আদবের সাথে পাথরটিকে চুমু
খেতে হয়। ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে হাত দ্বারা পাথর স্পর্শ করে হাতে চুমু খেলেও
হয়। সম্ভব না হলে হাতের লাঠি দ্বারা স্পর্শ করে লাঠিতে
চুমু খেলেও হয়। তাও সম্ভব না হলে হাত দ্বারা ইশারা করার জন্য উভয় হাত এমনভাবে
উঠাতে হবে যেন তালু হজরে আসওয়াদের দিকে থাকে এবং হাতের পিঠ চেহারার দিকে থাকে। ইশারা করে হাতের তালুতে চুমু
খেয়ে কাবার দরজার দিকে অগ্রসর হলেই তাওয়াফের চক্কর শুরু হয়।
এই
পূর্ব দিকেই জমজম কূপ। বর্তমান মার্বেল পাথরে এর আলামত হল, কিছুটা দূরত্বে চারটা চারটা করে পাথরের চারপাশে
চিকন স্টিল লাগানো আছে। বাকি পুরো মাতাফে কোথাও এরূপ স্টিলের চিকন রেখা এই
না-লায়েকের চোখে পড়েনি। গত শতাব্দির একেবারে শেষ দিকে আমার মুহতারাম বড় ভাই
হাসান আল হুদা যখন হজ্জের অনুগ্রহ লাভ করেন তখনো মাতাফ এটাই ছিল। তবে সিঁড়ি দিয়ে
নিচে নেমে মূল জমজমের পাড়ে যাওয়ার নিয়ম না থাকলেও সুযোগ ছিল। এখন আর নেই।
ব্যবস্থাপনা কর্তৃক ড্রাম/কলে বিতরণকৃত জমজমই এখন আমাদের জমজম।
মুফতি
শরিফুল ইসলামের কথামতো এক সময় হজরে আসওয়াদের খুব কাছাকাছি চলে এলাম। এক আল্লাহর
বান্দীকে শুনলাম ও দেখলাম অজদের হালাতে (খোদায়ী প্রেমে দুনিয়াবী বিষয়ে হিতাহিত
জ্ঞানশূন্য) অন্যরকম আবেগী আওয়াজে “আল্লাহ” “আল্লাহ” চিৎকার করতে করতে শত বান্দা ডিঙ্গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই
ভীড়ের প্রচণ্ডতা জয় করে চুমু খেয়ে ফিরে গেলেন। যতই অগ্রসর হচ্ছি নিজের অসহায়ত্ব
বৃদ্ধি পেতে লাগল। এই পুত-পবিত্র স্থানে আমার মতো এমন বিশ্বনাফরমানের কি উচিত হবে
মুখ লাগানোর স্পর্ধা দেখানো? ভাবতে
ভাবতে অধমকে এতটাই কাছে নিয়ে আসা হলো; ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। শরিফ আগেই বলে রেখেছিল, যদিও সাথে থাকব তবে আমি আজ চেষ্টা করব না- এতে
আপনার বেশি কষ্ট হবে। আমি ঠিক বলতে পারব না, কীভাবে যেন এক সময় পাপের পাহাড় দুটিকে ঐ মহান পাথরের
স্পর্শ দান করা হল। মনভরে চুমু খেলাম। অন্যদের সুযোগের জন্য নিজে বেশি সময় নেওয়া
যাবে না- কথাটা মনে ছিল। পরমভাবে বিশ্বাস করলাম, এখানে চুমু দেওয়া যায় না; চুমু দান করা হয়।
শরিফ
বারবার সাবধান করেছে, চুমুর
আগে শক্তি খরচ করবেন না। বের হতে অনেক শক্তি লাগবে। এবার অন্যদের অগ্রসর হওয়ার
সুযোগ সৃষ্টি করা দায়িত্ব। চেষ্টা শুরু করলাম। কিন্তু আল্লাহপ্রেমে আত্মভোলা
অগ্রসরমান বান্দাদের কি আর কাকে কী সুযোগ দেওয়া দরকার- সেদিকে খেয়াল করার সুযোগ
আছে? নালায়েকের
শরীরটা বের হতে পারলেও জীবনে কৃত অধিক পাপের রাজসাক্ষী ডান হাতটা আটকা পড়ল। কীভাবে
কী হল কিছুই মনে নেই- শুধু মনে আছে, ডান কানে বেশ জোড়েই “কট” করে
একটা আওয়াজ শুনলাম। শরিফের শরাফতি তখনো শেষ হয় নাই। সে একরকম কোলে করার মতোই
আমাকে মাতাফের প্রায় শেষ দিকে -যেখানে
কালো গিলাফের আশেকীন শুধুই মাশুকের দিকে তাকিয়ে থাকে- নিয়ে গেল। বসলাম, অনুমান হলো ডান হাতটা কাঁধের জোড়া থেকে কিছুটা
সরে গেছে। শরিফ গায়ের জোর দিয়ে মালিশ করতে লাগল। কোন দেশী কোন বর্ণের কিছুই জানি
না, একজন
মা এক বোতল পানি এগিয়ে দিয়ে বললেন, জমজম। ইশারায় আঘাতের স্থানে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করতে বলে
তিনি চলে গেলেন। অজানা-অচেনা এক নাফরমানের জন্য তিনি তখন কী দোয়া করেছিলেন- আমার
জানা নেই। জমজম মালিশ করতে করতে আবার একটা আওয়াজ হল। মনে হল, হাতটা পূর্বের জায়গায় এসে লেগেছে। শরিফ বারবার
চেষ্টা করেছিল, ডাক্তার
দেখাতে। আমি বলতাম, আগে
দেশে যাই। আমার সফর ছিল বাইশ দিনের। এটা প্রথম দিকের ঘটনা। বাকি সময়টা আর ডান কাত
হয়ে ঘুমানো সম্ভব হয়নি। দেশে আসার পরও অনেক দিন ব্যথাটা ছিল। চিকিৎসা করানোর
জন্য বলেছে অনেকেই। কিন্তু আমি তো জানি, এটা পাপের পাহাড় স্পর্শ করানোর শাস্তি। মনে মনে আশা জাগত– সারা জীবন এ ব্যথা বয়ে বেড়ানোর সৌজন্যে যদি
মাফ পেয়ে যাই! চিকিৎসার জন্য কেউ বেশি চাপ দিলে বলতাম, হজরে আসওয়াদের ব্যথার চিকিৎসা করার ডাক্তার তো
পাই না। আপনি খুঁজে দিয়েন।
হজরে
আসওয়াদ থেকে চক্কর শুরু করে কদম বাড়ালেই মুলতাযাম। হজরে আসওয়াদ ও আল্লাহর ঘরের
দরজার মধ্যবর্তী স্থান। দোয়া কবুলের বিশেষ স্থানসমূহের অন্যতম। শাব্দিক অর্থ এঁটে
থাকার জায়গা। আশেকীন এ স্থানে বুক হাত মুখ লাগিয়ে দোয়া করে থাকেন। এখানে দোয়া
করা মুস্তাহাব। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আনা
ইনদা জন্নি আবদি বী”। আমার মরহুম মুশফিক উসতায
মাওলানা আবদুল আউয়াল রহ. এই হাদিসের ভাবার্থ করতেন: “যে ভাবে যেমন; তার খোদায় তেমন”। ওলামায়ে কেরাম ইযায়ে মুসলিম -অন্য মুসলমানের
যেন কষ্ট না হয়- পুরো
হজের সফরেই বিষয়টার প্রতি খুব খেয়াল রাখতে বলেন। মাসআলাও তাই; হজরে আসওয়াদে যেমন দুই হাত
রেখে চুমু খাওয়া, সম্ভব
না হলে হাতে ছুঁয়ে হাতে চুমু খাওয়া, সম্ভব না হলে হাতের লাঠির মাধ্যমে, তাও সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারায়। মুলতাযাম ও
বাবুল কাবা এর বেলায় যদি কোনো গোনাহগারের এই বিশ্বাস তৈরি হয়- হজরে আসওয়াদের করণীয়
যেমন দূর থেকে ইশারায় আদায় হয়; তেমনি মুলতাযামে যে ভিড়তে পারে না, বাবুল কাবা যে ছুঁতে পারে না আরহামুর রহিমীন কি
তাকে মাহরুম করবেন? যে
বিশ্বাস করতে পারবে এই বরাবর আসলে মুলতাযামের বারাকাহ দান করা হয়। যে বিশ্বাস
করতে পারবে, এই
বরাবর আসলে বাবের মাগফিরাত দান করা হয়। হে শওকত! ঐ গোনাহগারকে তুমি “আনা ইনদা জন্নি আবদি বী”-এর ওপর ছেড়ে দাও।
আরো
অগ্রসর হলে সামনে আসবে মাকামে ইবরাহীম। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন লিফট। কুদরতী
লিফট। ইবরাহীম আ.-এর পায়ের ছাপ সম্বলিত পাথর। বর্তমানে দৃষ্টিনন্দন সোনালী
মিনারাসদৃশ বক্সে দর্শনীয় উপায়ে সংরক্ষিত। এই পাথরে দাঁড়িয়ে ইবরাহিম আ.
বাইতুল্লাহ নির্মাণের কাজ করেছিলেন। তাঁর মোজেজা হিসেবে পাথরটি প্রয়োজনানুসারে
কুদরতী উপায়ে তাকে নিয়ে উঠানামা করত। ফিকাহ মতে, মাকামে ইবরাহীমের সাথে তাওয়াফের কোন আমল সংশ্লিষ্ট নয়। তাওয়াফকালে
মাকামে ইবরাহীমে নজর পড়লে যদি খুব ভক্তিসহ কয়েকবার দুরুদে ইবরাহীম পড়তে মনে চায়
পড়ে নিও; কেউ
বাধা দিবে না। যদি দিল চায় পিতাজীকে হাদিয়া করার নিয়্যাতে আরো কিছু তেলোওয়াত তাও
করিও। যদি মনে চায় সুরা ইবরাহীম তেলোওয়াত করবে- বাধা দেওয়ার কেউ নেই। যদি মনে
চায়- একশ’ বার
সুরা ইখলাসের হাদিয়া পাঠাবে তাও পাঠাতে পারো। পাগলের এসব কথার ফিকহী দলিল চেও না।
যদি দলিল চাইতে মনে চায়- বুঝে নিও তুমি এখনও ...।
মাতাফের
আরেক আকর্ষণ হাতিমে কাবা। তাওয়াফের
সময় হাতিমকে বাদ দিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করলে তাওয়াফ সহিহ হবে না। ইবরাহীম আ.-এর
নির্মাণে উত্তর দিকের এই ছয় হাত জায়গাও ঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবুওয়াতের ৫ বছর
পূর্বে পুনঃনির্মাণকালে কুরাইশরা হালাল সম্পদ দ্বারা নির্মাণের বাধ্যবাধকতা আরোপ
করে পুরো কাবাকে চারভাগ করে চার গোত্রপতিকে দায়িত্ব দেয়। একেবারে
উত্তরাংশের দায়িত্ব অর্পিত হয়, বনু আদি বিন কাব বিন লুওয়াই-এর ওপর। হালাল অর্থের অভাবে
তারা নির্মাণে ব্যর্থ হলে এ অংশটুকু ঘেরাও দিয়ে হাতিম (পরিত্যক্ত অংশ) হিসেবে
রেখে দেওয়া হয়। ঐ অর্থাভাব আজ বিশ্ব মুসলিমের জন্য আল্লাহ তায়ালার মহান অনুগ্রহ
হিসেবে পরিগণিত। হাতিমে প্রবেশ, হাতিমে
নামাজ, হাতিমে
মুনাজাত মানে বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ, বাইতুল্লাহর ভিতরে নামাজ, বাইতুল্লাহর ভিতরে মুনাজাত।
হাজরে
আসওয়াদ, মুলতাযাম, বাবুল কাবা, মাকামে
ইবরাহীম, হাতিম এই পাঁচের পাশাপাশি
আরেক আকর্ষণ গিলাফে কাবা। হাতিম পার হয়ে রুকনে ইয়ামানির দিকে যাওয়ার সময় অর্থাৎ
পশ্চিম দিকটায় গিলাফের স্পর্শ লাভ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে থাকে। সুযোগ করতে পারলে
হাতছাড়া করার প্রশ্নই আসে না। গিলাফ ধরে তাওবা করার স্বাদ জীবনে বারবার নাও আসতে
পারে। কালো গিলাফের গোপন শুভ্রতা দেখার দৃষ্টি যাদের আছে তারা বড়ই ভাগ্যবান। আমি
দুর্ভাগা দোয়া করি মালিকে কাবা তার ঘরের কালো গিলাফের গোপন শুভ্রতা দেখার দৃষ্টি তোমায় দান করুন। পদার্থ বিদ্যার
প্রতিষ্ঠিত নীতি হিসেবে “ব্ল্যাকবডি এমন বস্তু যা সব
আলো শোষণ করে।” আমার গ্রাম্য ভাষায় যদি বলি-
বে নী আ স হ ক লা’র ছয়টি রং খেয়ে ফেলে যে রং
তাকেই বলে কালো রং। এই কালো গিলাফ বান্দার জীবনের যত অনাচার অত্যাচার যত পাপতাপ যত
গুনাহ যত মাসিআত সব খেয়ে ফেলে বলেই এর প্রতীকী রং কালো। ভিতরে শুভ্র সাদা। তুমি
চক্কর লাগাতে থাকো আর মুনাজাত করো তিনি যেন তোমায় বান্দা বলে স্বীকৃতি দিয়ে দেন; ব্যস। তাহলে বাকি সব অটো হয়ে যাবে। সারা দুনিয়া
থেকে তার অভিমুখী হলেই কালো
গিলাফ বান্দাকে পবিত্র করতে থাকে। আর এত কাছে নিয়ে যাওয়ার পর তোমাকে দান করা হবে
না, তা মানা যায় না। শুধু বান্দা
হয়ে যাও। আমার একজন অতি শ্রদ্ধাভাজন মহান ব্যক্তিত্ব মাওলানা উবায়দুর রহমান খান
নদভী দা.বা.কে দেখেছি, তিনি চান সব সময় কেবলামুখী
হয়ে সময় কাটাবেন। এই স্বার্থে দৈনিক ইনকিলাব-এ থাকাকালে বড় রুম ব্যবহারের সুযোগ
থাকা সত্ত্বেও তিনি ছোট একটা টেবিলে দীর্ঘ বছর কাটিয়েছেন। বেফাক-এ আসার পর রুমের
পূর্ব সেটিং পরিবর্তন করেছেন।
প্রিয়
অনুজ! হাজরে আসওয়াদ। মুলতাযাম। বাবুল কাবা। মাকামে ইবরাহীম। হাতিম। কালো গিলাফ।
এসব বলে বলে চক্করের শুরু থেকে পূর্ব উত্তর পশ্চিম তিন দিকেই তোমাকে ব্যস্ত
রেখেছি। রুকনে ইয়ামেনী থেকে হাজরে আসওয়াদ এই দক্ষিণে আর তোমাকে ব্যস্ত করার
দুঃসাহস আমার নেই। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গপোসাগর। সাগর
যেমন ডুবাতে জানলে মণি মুক্তা হীরা জহরত অনেক কিছু দেয়। বাইতুল্লাহর দক্ষিণের যে
ডুবুরি-বিদ্যা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন, তা নিয়েই তুমি ব্যস্ত থাক। ডুবিয়ে যত গভীরে যেতে পারবে ততই
অমূল্য মণি মুক্তা হীরা জহরত পেতেই থাকবে। আশা করি, নববী
সে ডুবুরি-বিদ্যা কী তা তুমি বুঝতেই পারছ- “রব্বানা
আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার”। মনে রাখবে, দুনিয়ার
হাসানা আমলের তাওফিক আর আখেরাতের হাসানা আমলের প্রতিদান। দুনিয়ায় প্রতিদান চাওয়া
বা পাওয়া প্রকৃত হাসানা নয়। বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে বলে রাখি, তাওয়াফকালে
বাইতুল্লাহর দিকে তাকানো নিষেধ; সুতরাং হাজরে আসওয়াদ।
মুলতাযাম। বাবুল কাবা। মাকামে ইবরাহীম। হাতিম। কালো গিলাফ। এগুলোর জন্য তাওয়াফ
ব্যতীত আলাদা সময়ে চেষ্টা করতে হবে। খাদিমুল হারামাইন (বাদশাহ)-এর আইন মান্য করতে চাইলে ওমরার তাওয়াফের আগে বা পরে ছাড়া অন্য সময় করা যায়
না। ওমরা আদায়কালে তাওয়াফ শেষ করে সায়ী শুরু করতে বিলম্ব করাতে ফেকহী কোন অসুবিধা
নাই।
হজরত হাজেরা
আ.-এর স্মৃতিবিজরিত সেই সায়ী। সায়ীর জন্য পাহাড়ে উঠতে হয়।আধুনিক কালের বিদ্যুৎচালিত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পাহাড়-আরোহণ-কল্পনা করতে পারার যোগ্য সেই
দিলের বড়ই অভাব। পাথুরে সিঁড়িও আছে। যদি ভাগে পাও। সায়ীর স্থানে নামার পর ডান দিকে আগালে সাফা।সাফা থেকে কিবলামুখী হলে কালো গিলাফের সেই ঘর। পৃথিবীর জমিনের সর্বপ্রথম ঘর। “ইন্না আউওয়ালা বাইতিন...।” হেদায়েতের ঘর। হজরত ইবরাহীম আ.-এর হাতে নির্মিত ঘর। মহান মাওলা পাকের ঘর। সকল মুমিনের হৃদয়ের সবচেয়ে ভালোবাসার সবচেয়ে প্রিয় সর্বাধিক আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ কামনার চির সুন্দর চির অম্লান চির অমলিন কালো গিলাফে মোড়ানো সেই ঘর। ঘরের দিকে ফিরেই নিয়ত করতে হয় সায়ীর। যদি দিল চায় তুমি মনে মনে এই মুনাজাত করো- আয় আল্লাহ! হজরত হাজেরা আ.-এর মাকামকে আপনি আরো উঁচু করুন। হজরত ইবরাহীম-ইসমাঈল আ.কে পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে জাজা দান করুন।হজরত হাজেরার মৃত্যুপথযাত্রী শিশু সন্তানের জন্য জ্ঞানশূন্য পাগলিনী মায়ের সেই দৌড় সেই সায়ীর পর থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত যত ঈমানদার জিন ও ইনসানকে আপনি সায়ীর তাওফিক দিয়েছেন সকলের সায়ী কবুল করুন। আমার ও আব্বা আম্মার নিয়তকেও কবুল করুন। আমাদের জন্য সহজ করুন। কোয়ামত অবধি
আরো যাদের তাওফিক দান করবেন তাদের সকলের জন্য সহজ করুন।যদি দয়া হয়, সাথে যুক্ত করো সেই কাফেলায় যেন আল্লাহ তায়ালা মাহমুদা, মাইমুনা, মাহমুদ, মাইমুন, তোমার রাবেয়া বসরী ভাবী ও এই গোনাহগারাকেও বারবার শামিল করেন। আমীন।
সাফা
থেকে সায়ী শুরু করে কিছুদূর অগ্রসর হলেই সবুজ বাতি। সবুজ বাতি দেখে দৌড় দাও আর একটু কল্পনা করো, মুলতাযাম থেকে সামান্য পূর্ব-উত্তরে শিশু ইসমাঈল আ. প্রচণ্ড পানির পিপাসায় মরণযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। সর্বশেষ জীবনী শক্তিটুকু
দিয়ে দুই পা ছুঁড়ে চলেছেন। আর এদিকে হাজার হাজার মাইল অবধি জনমানবহীন এক গা ছমছম পরিবেশে নিরুপায় মা পানির মিথ্যা আশায়
দৌড়ের পর দৌড় দিয়েই চলেছেন। তিনি
জানেন না এই দৌড়ের কী কারণ! কী মাহাত্ম্য! সেদিনের সেই সাত
দৌড়ে সাত আসমান সাত জমিন জুড়ে কী ঘটেছিল কে জানে? সেই সাত দৌড়ের বিনিময়েই তো পৃথিবীর সাত জমিন জান্নাতী কূপ জমজমের মালিক হলো। হে পৃথিবী! হে পৃথিবীর মাটি! তুমি কি হজরত হাজেরা আ.-এর এই অবদানের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো? নিশ্চয়ই করো। তুমি তো আমি নাফরমানের মতো অকৃতজ্ঞ নও।তোমার বুকেই তিনি সমাহিত আছেন। তাঁর সাথে অতি কোমল আচরণ করিও। এই নালায়েকের পক্ষ থেকে তাকে পৌঁছে দিও সশ্রদ্ধ সালাম। হে জমিন! তুমি সংকোচ করো না। আমি আশা করি, তিনি আমায় চিনবেন। কীভাবে চিনবেন
সে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে এসো না। কিছু গোপন গোপনই থাকতে দাও।
হাজী সাব! তোমাকে সবুজ বাতির নিচে রেখে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম। আমায় ক্ষমা করো। সায়ীকালে জমজম পানের ব্যবস্থা রেখেছে খাদিমুল হারামাইন আশশরিফাইন
(সৌদী বাদশাহ)। অনেক সময় কোন ব্যক্তি/কোম্পানির পক্ষ থেকে খেজুর, ব্রেড, বিস্কিটসহ নানা প্রকার হাদিয়াও মিলে থাকে। যে
কোন হাদিয়া গ্রহণ করতে পারো। যা ইচ্ছা খেতে পারো। ফেকাহ মতে তোমার সায়ী আদায় হয়ে
যাবে। আচ্ছা শওকত! বলো তো, এই সায়ী যে সায়ীর অনুকরণ, তা সামান্য স্মৃতিচারণ করলে এই খানা এই পানীয় গ্রহণ করা যায়? আম্মাজান হাজেরা আ.-এর মুহাব্বত যদি তোমাকে সাত সায়ী পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত দানাপানি গ্রহণ থেকে বারণ করে তাহলে আমার বলার কিছু নেই।
যদি বারণ না করে তাহলেও আমার বলার কিছু নেই। সাফা-মারওয়া, আবার মারওয়া-সাফা করে করে সাত চক্কর শেষ হলে বাকি থাকল হালাল হওয়া।নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম হলককারীর জন্য তিনবার
দোয়া করেছেন। আর কসর-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম রাদি-এর জিজ্ঞাসার জবাবে চতুর্থবার দোয়া করেছেন।এই হলক যেন সমস্ত অস্তিত্বে বিদ্যমান সকল গুনাহ ঝরে পড়ার চূড়ান্ত প্রতীক।একাধিক ওমরা আদায়ের ইচ্ছা থাকলেও প্রথমবার হলক করা যায়।পরের বার সারা মাথায় ক্ষুর চালালেই হুকুম আদায় হয়ে যাবে। চুল থাকুক আর নাই থাকুক। মনে রাখবে, মেশিন দিয়ে যত ছোটই করা হোক সেটা কসরের হুকুমে গণ্য হবে। হলক হতে হলে ক্ষুর বা ব্লেড আবশ্যক।
হালাল হয়ে গেলে এবার স্বাভাবিক পোশাকে সময় কাটাও। যত বেশি সম্ভব হয় নফল তাওয়াফ এখন সর্বোত্তম আমল।
সৌদী সরকারের নিয়মানুযায়ী ইহরাম ছাড়া নিচ তলার মাতাফে যাওয়ার সুযোগ নাই।ওমরার ইহরাম ব্যতীত শুধু চাদর পরে গেলে সেটা ধোঁকার অন্তর্ভুক্ত হবে।আমার আব্বাজান রহ. যখন হজে গিয়েছিলেন তখন এই নিয়ম ছিল না।তাও আব্বা নফল তাওয়াফ অধিকাংশ দ্বিতীয় তলার মাতাফে করেছেন।জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? আব্বার উত্তর শুনে শুধু চুপ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। আব্বার সাধারণ চেহারায় হাসিমুখে সোজা উত্তরটা ছিল “বেশি কদম দিলাম, বেশি গুনাহ মাফ হল, বেশি সাওয়াব পেলাম।” আসলে ওটা যুক্তিতর্কের মাকাম নয়। এখানে “আনা ইনদা জন্নি আবদী বী”টাই
বড় কথা। আয় আল্লাহ আমার বাবার সাথে হাশরের ময়দানে আপনিও সহজ-হাসিমুখ ফায়সালা
করিয়েন। আমীন। আব্বার হজের সফর ছিল ২০১৩ সালে। দারে ক্বরারের সফর হয়েছে ২০২৫ সালে।
উল্লেখ্য অতি ইদানিং দ্বিতীয় তলার মাতাফে যেতেও ইহরাম লাগে বলে শুনেছি।
যদি
সুযোগ পাও তোমার মাকে কোন ক্লান্ত অবস্থায় নফল তাওয়াফের প্রস্তাব দিয়ে হুইল
চেয়ারে তাওয়াফ করানোর একটা অপূর্ব সম্পদ জীবনে অর্জন করে নিও। প্রথম সফরে একদিন
দেখি এক কিশোর একজন স্বাস্থ্যবান মুরব্বিকে তাওয়াফ করাতে করাতে বেশ হাফিয়ে উঠেছে।
সুযোগ প্রদানের আবেদন জানালাম, হাসিমুখে
সম্মতি দিল। এক অচেনা আল্লাহর বান্দার হুইল চেয়ারসহ তাওয়াফে যদি এত স্বাদ! না
জানি যিনি আমাকে দশমাস...। যিনি আমাকে দুই বছর...। যিনি আমাকে তার সারাটা
জীবন...। প্রিয় হে! তুমি তোমার মতো
করে ভাবতে থাকো। আমার কলম এ প্যারাটা পূর্ণ করতে অক্ষম। এ মহান নেয়ামত অধমের
ভাগ্যে বোধ হয় নেই। হুইল চেয়ার আবিষ্কারের আগে তো বহু ছেলে মাকে আপন কাঁধে বহনের
সৌভাগ্য লাভ করত। পৃথিবীর বুকে যেমন সবচেয়ে ভারী বোঝা বাবার কাঁধে সন্তানের
জানাযা। আর সবচেয়ে প্রিয় বোঝা ছেলের কাঁধে তাওয়াফকারিণী মা।
আম্মাজান
হজরত আয়েশা রাদি.-এর মসজিদ থেকে অবশ্যই ইহরাম করবে। যখন যাবে চেষ্টা করবে
আম্মাজানের জন্য কিছু ঈসালে সাওয়াব করতে। আমি প্রথমবার গিয়েছি সময় আম্মাজান এক
নাফরমানকে মহান মেহমানদারি করিয়েছিলেন। মায়ের দান তো মায়ের শান মতো হবেই। আয়
আল্লাহ! সারা উম্মতের পক্ষ থেকে আম্মাজানকে আপনি উত্তম বিনিময় দান করুন।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি
ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম।
বড়
আম্মাজানের দরবারও এ শহরেই। জান্নাতুল মোয়াল্লায়। তাঁর মেহমানদারি পাওয়া তিন
ভাগ্যবান ব্যক্তিকেও আমি জানি। তাদের এই সৌভাগ্য দানের জাহেরি সবব হিসেবেও আল্লাহ
তায়ালা মুফতি শরিফুল ইসলামের শরাফতিকে কবুল করেছেন। কোনো দিন মধ্য রাতের পর যেতে
পারলে পেতেও পার। খুব বিনয় ও ভক্তিসহ জিয়ারতে যাবে। ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে কিছু
তেলোওয়াত করবে। আম্মাজানের কবর জিয়ারতে গেলে সামনের দাঁড়ানোর স্থানটুকুর পাশের
ছোট দেওয়ালটায় অনেকেই বসেন। ফিকহের দৃষ্টিতে কোন অসুবিধাও নাই। তবে আমার নিজের
বেলায় বসাটা ভালো মনে হয় নাই।
খুব
করে মনে রাখবে, “আল্লাহ তাড়াহুড়া পছন্দ করেন না।”
“এই শহরে হাঁটাটাই একটা
ইবাদত।” “কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফী শান”। এই তিনটা জুমলা মনে থাকলে
তুমি আর পেরেশান হবে না। মসজিদুল হারামের পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা বারবার পরিবর্তন হতে থাকে। এতে অনেকে পেরেশান
হয়। কেউ কেউ না বুঝার কারণে বিরক্ত হন- এমনটাও দেখেছি। যে সর্বক্ষণ মনে রাখে-
আমিতো এই শহরে প্রবেশেরই যোগ্য নই। তার আবার বিরক্ত হওয়ার অধিকার কোথায়? মুনতাজিমীনরা যখন যা বলে বিনা দ্বিধায় মেনে
নিবে। কোনো প্রকার প্রশ্ন তুলবে না। না মুখে না মনে? মাওলার বাড়িতে প্রশ্ন তোলার অধিকার যার আছে সে তো বান্দা
হওয়ার কথা নয়। অন্তত আমি তুমি আমরা তো নইই।
মিনা, মুযদালিফা, আরাফায় জিয়ারতে নিয়ে যাওয়া ওমরা সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত
থাকে। গারে হেরা, গারে
সাওর, তায়েফ
ইত্যাদি যেতে হলে নিজ গরজে নিজ খরচে যেতে হয়। তায়েফ গেলে ফিরার পথে মীকাত থেকে
ইহরাম করে আরেকটি ওমরা করা যায়। সবমিলে পুরো সময়টাই ক্ষমা-মাগফিরাত-মারেফাত
লাভের এক অনন্য সুযোগ। সে বড়ই বোকা যে এখানে এই মোবারক সফরকেও অন্যান্য দুনিয়াবী
সফরের ন্যায় তামাশা, মার্কেটিং
আর সেলফিং পিকচারিং-এর সফর বানায়। আমার শায়েখ দা.বা. সফরসঙ্গীদের
বলে দেন, কোনো মার্কেটিং করা যাবে না। যা কিনতে চাও বিদায়ের
একদিন আগে। কারণ মার্কেট শুরু করলেই ফিকিরটা পাল্টে যায়।
তোমার
চিঠির উত্তর লিখতে শুরু করি সময়, তোমরা
আগে মদীনা মুনাওয়ারাহ যাবে তা আমার জানা ছিল না। আমাদের দেশী বেশির
ভাগ কাফেলা শুরুতে মক্কা মুকাররমায় যায় বিধায় ঐ ধারণা থেকেই লিখতে শুরু করেছি।
পরে জানলাম। শুরুতেই ইচ্ছা ছিল মদীনা শরীফ সম্পর্কে একটা ফিকহের কিতাবের অনুবাদ
যুক্ত করে দিব। অল্প কয়েকটা কথা বলেই অনুবাদটা যুক্ত করে চিঠি সমাপ্ত করার ইচ্ছা।
বালাদুল
আমীনে প্রবেশের ইহরাম তো জাহেরি ও বাতেনি দুই প্রকার। বাতেনি ইহরামের কোনো জাহেরি
মুআখাজা হয় না। প্রিয় মক্কার সীমানা যেমন হুদুদে হারাম। প্রিয় মদীনার সীমানাও
তেমন হুদুদে হারাম। মক্কা নগরী ও তার আশপাশে যে কাউকে তুমি যদি বল “হারাম”
সে তোমাকে মসজিদুল হারামের পথ দেখিয়ে দিবে। আর মদীনা শরীফের আশপাশ
যে কোন স্থান থেকে তুমি যদি বল “হারাম” সে তোমাকে মসজিদে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম দেখিয়ে
দিবে। হারামে মক্কার মতো হারামে মদীনায় যদিও জাহেরি ইহরামের উসূল নেই; তবে বাতেনি ইহরাম এখানেও আছে। আশাকরি, বাতেনি ইহরামের ব্যাখ্যা তোমাকে দিতে হবে না।
অল্প কথায়- সব রকমের দুনিয়াবী ফিকির থেকে মুক্ত হয়ে শুধুই হাবীবে খোদা
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের জিয়ারতের তামান্নায় বে-কারার, বে-চাইন, বে-তমানীন হয়ে যাওয়া। জাহেরিভাবে খুব কেতাদুরস্ত হলেও মন
যেন হয়ে থাকে পাগলপারা। দেওয়ানা। মজনুন। হলক শেষে জাহেরী ইহরাম খুলে ফেলতে হয়।
বাতেনী ইহরাম খোলার কোন আদেশ নেই। মদীনাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামে
থাকতেই যদি কারো বাতেনী ইহরাম খুলে যায় সে বড়ই বদনসীব। ভাগ্যবান সে যার সারাটি
জীবন এই ইহরামেই কেটে যায়। এ জীবন যদি পাক মদীনার বাতেনী ইহরামে কাটাতে পার ...।
চোখ কলমকে স্তব্দ করে দিয়েছে। আমি এখানে আর লিখতে পারছি না ভাই। সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি
ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম।
বিভিন্ন
আলামত বিশ্লেষণ করলে বর্তমান মসজিদে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি
ওয়াসাল্লামের মূল যে সীমানা -অর্থাৎ গেইট নম্বর ৩০১ থেকে ৩৬৯- এটাই নবীয়ে কারীম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের যুগের মদীনাতুন নবী-মদীনা শহর। এই
সীমানার ভিতরে আদব-ইহতেরাম থাকা চাই খুব বেশি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম হায়াতুন নবী। “ওয়া হুয়া ফী কবরিহী হাইয়্যুন”। আহলুস
সুন্নাহ ওয়াল জামাআর এটিই আকীদা। মনে রাখবে, এই সীমানার ভিতরে সব কিছু তিনি
সরাসরি দেখার মতো দেখেন। সরাসরি শোনার মতো শুনেন। ইচ্ছা করলেই সম্ভব এখানে জুতা
ব্যবহার করব না। আলহামদুলিল্লাহ অধম এই সীমানা, জান্নাতুল বাকী ও হারামে মক্কাতেও মসজিদুল
হারামের সিহানের শেষ পর্যন্ত যেখানে হাঁটু-কোমর পরিমাণ লম্বা পিলার বসানো আছে
এতটুকুর ভিতরে কোথাও জুতা ব্যবহার করি নাই। প্রয়োজনে চামড়ার “পায়েতাবা”
সাথে রাখতে পারো।
মদীনা
শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার শুরু থেকে বিদায় নিয়ে আবার হারামে মদীনা অতিক্রম
করার পূর্ব পর্যন্ত সালাত ও সালামের সবিশেষ ইহতেমাম আবশ্যক। ইহতেমামের তাওফিকের
জন্য এখন থেকেই সালাত ও সালামের আমলের পরিমাণ বাড়ানো ও দোয়া করা উচিত। কোন কোন
উম্মতির দিল কখনোই এই সীমানার বাইরে আসে না “ক্বলবুহু মুআল্লাকুন বিল
মাদীনাতি”। তাদের ব্যাপারে কলম চালানোর
যোগ্যতা আমার নেই। আর এখন
ইচ্ছাও করছি না। এই শহরে থাকাবস্থায় কে কতটুকু প্রেমের নজরানা পেশ করতে পারলো সেটাই মূল
কথা। প্রকৃত প্রেমিক জাহেরি কুরবতকে প্রাধান্য দেয় না। কাউকে কষ্ট দিয়ে অগ্রসর
হওয়ার চেয়ে পিছনে থাকাই শ্রেয়।
মাশুকের
দরবারে যুক্তিখোঁজা প্রেমের ধর্ম নয়। আমার একজন বাবাজী ছিলেন। মসজিদের ৪নং বাব
দিয়ে প্রবেশ করে ভিতরে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বসতেন। ৫০ বছরের অধিক সময় মদীনা
শরীফের বাইরে যান নাই। এ অবস্থানের লক্ষ্যে ঘর-সংসারও পাতেন নাই। তাকে একদিন বললাম, একবার আপনার সাথে সালাম দিতে যেতে চাই। : “আমি এখান
থেকেই সালাম জানাই। অত কাছে যেতে আমার ভয় হয়।” আফসোস! গত হজ মৌসুমে সরকার তাকে দেশে পাঠিয়ে
দিয়েছে। এক পাকিস্তানী ভাইয়ের মাধ্যমে জেনেছি, বাবাজী দারুল ক্বরারের সফরে
চলে গিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আয়
মাওলা! বাবাজী এক বান্দাকে নিজের রূহানী সন্তান বানিয়েছিল।
মসজিদের ৪নং বাব দিয়ে প্রবেশ করে ঐ নির্দিষ্ট স্থানটা প্রার্থনা করার দুঃসাহস তার
নেই। নিজের গুনাহেপূর্ণ আমলনামার কারণে কল্পনা করতেও সে লজ্জা পায়। ইয়া আরহামার
রাহিমীন! আপনার রহমত আর রহমাতুললিল আলামীনের শফকতে সে কি
পেতে পারে না? প্রেমের নজরানা পেশ করতে প্রেম তো থাকতে হয়।
প্রেমশূন্য এই অন্তর মদীনা শরীফের অযোগ্য। এই অযোগ্য কোনকালেই আশেকে সাদেক হতে
পারব না; তবে
সাজার ভান করার চেষ্টা তো করতে পারি। ভান করাটা যদি ভণিতা না হয় তবে তাতে দোষ নেই।
স্নেহের
শওকত! তুমি তো মোবাইল বা কম্পিউটারের ডিসপ্লেতে চিঠি পড়ছ। আমি কিন্তু মূল চিঠি
লিখছি, দোয়াতে কলম চুবিয়ে চুবিয়ে সাদা কাগজের বুকে। শেষ হওয়ার চিঠি এ নয়। তোমার
শুকরিয়া আদায় করি। আমার বিশ্বাস, তোমার পাথেয় চাওয়াটা দিলী
চাওয়া ছিল। তাই মহান মাওলা অধমের কলমকে কিছু সুযোগ দান করলেন। জানো তো
লেখক-সাহিত্যিকদের কেউ কেউ অন্যকে লিখার সময় খুব লিখে অথচ নিজে ঠনঠন। আমি তাদের
অন্যতম। তোমার পূর্ণ সফরে অযোগ্য এই বড় ভাইয়াকে মনে রেখো। আব্বা ও জামিল আল জাহিদ
দুজনকেই তুমি দেখেছো। বিষয় উল্লেখ করে কোনো দোয়া চাইব না। চিঠিটা শেষ করতে পারছি না, তাই আল ফিকহুল মুইয়াসসার
কিতাবের শেষ দুই পৃষ্ঠার অনুবাদ যুক্ত করে লিখা বন্ধ করছি।
জিয়ারতুন
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে আমার কবর জিয়ারত করবে; তার জন্য সুপারিশ করা আমি আমার ওপর আবশ্যক করে
নিলাম।” তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “যে হজ করল অথচ আমার জিয়ারতে আসল না; সে আমার সাথে রুক্ষ আচরণ করল।”
নবী
কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের রওজা শরীফের জিয়ারত একজন
উম্মতের জীবনে সর্বোত্তম নফল আমল। আল্লাহ তাআলা যাকে হজ্জে বাইতুল্লাহর সৌভাগ্য
দান করেন; তার
উচিত সে যেন অবশ্যই হজের পরে বা পূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি
ওয়াসাল্লামের জিয়ারতে যায় এবং জিয়ারতে যাওয়ার নিয়ত করার পর থেকে বেশি বেশি
সালাত ও সালামের আমল করতে থাকে।
মদীনা
শরীফে পৌঁছার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের দরবারে গমনের
সম্মানার্থে উত্তমভাবে গোসল করবে। সুগন্ধি ব্যবহার করবে। উত্তম কাপড় পরিধান করবে। অতঃপর
অত্যন্ত বিনয় নম্রতার সহিত ধীরে ধীরে স্থিরচিত্তে মসজিদুন নববী শরীফে প্রবেশ
করবে। দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করবে। মনখুলে যতইচ্ছা দোয়া করবে। এরপর
কবর শরীফের দিকে রওনা হবে।
ভীত
সন্ত্রস্ত হয়ে সর্বোচ্চ আদব-ইহতেরামের সাথে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। সালাম পেশ
করবে। দুরুদ শরীফ পাঠ করবে। যারা সালাম পৌঁছানোর আবেদন করেছেন সকলের সালাম পেশ
করবে। সব সেরে আবার মসজিদে নববীতে প্রবেশ করবে। যতইচ্ছা শুকরিয়ার নামাজ পড়বে।
দুরুদ শরীফ পাঠ করবে। মোনাজাতে নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, সকল মুসলমানের জন্য ও যারা আবেদন করেছেন তাদের জন্য মনভরে
দোয়া করবে।
মদীনাতুল
মনোয়্যারায় অবস্থানকে জীবনের অন্যতম সুবর্ণ সুযোগ মনে করবে। রাত্রি জাগরণের
চেষ্টা করবে আর যখনই সুযোগ পাবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের
জিয়ারতে যাবে। অধিক পরিমাণে তাসবিহ, তাহলিল, তাওবা, ইস্তেগফারে মশগুল থাকবে।
সাহাবায়ে
কেরাম, তাবেয়ীগণ
ও সালেহীন রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন-এর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে জান্নাতুল
বাকীতে যাওয়া মুস্তাহাব। মদীনা শরীফে অবস্থানকালে প্রতিটি নামাজ মসজিদে নববীতে
আদায় করা মুস্তাহাব। বিদায়ের পূর্বক্ষণে দুই রাকাত নামাজের মাধ্যমে মসজিদে নববী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিদায় লওয়া মুস্তাহাব। এই
নামাজের পরও মনভরে দোয়া করবে। এরপর মোয়াজাহা শরীফে যাবে এবং বিদায়ী ব্যথাসহ
সালাত ও সালাম পাঠ করবে। বিদায়ী সালাম পেশ করবে। পরিশেষে নবীজী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের বিয়োগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে কাঁদতে কাঁদতে
বেরিয়ে আসবে। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম।
ইতি
হানিফ
আল হাদী
০৯/১০/২০২৫ঈ.
স্নেহের
শওকতকে উত্তর পাঠানোর পরও আরেক স্নেহের ছোট ভাই মুফতি আতিকুল্লাহ-এর সৌজন্যে আরো
কয়েকটি প্যারা যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হওয়ার এই ধারাবাহিকতা আল্লাহ চাইলে দীর্ঘ হতে
পারে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন